অত্যন্ত সস্তা এবং ওপেন-ওয়েট এআই প্রযুক্তির প্রতিশ্রুতি দিয়ে শেয়ারবাজারে এনভিডিয়ার (Nvidia) মূলধনে ধস নামানোর ঠিক ১৮ মাস পর, প্রযুক্তি বিশ্বে বিপ্লব আনা ডিপসিক (DeepSeek) এবার তাদের ব্যবসায়িক কৌশলে বড় পরিবর্তন আনল। চীনা এই এআই ল্যাবটি এখন চীনের মূল ভূখণ্ডে একটি বৃহৎ আইপিও (IPO) নিয়ে বাজারে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছে, যার ফলে তাদের এআই ব্যবহারের খরচও অন্যান্য বৈশ্বিক করপোরেট প্রতিষ্ঠানের সমপর্যায়ে পৌঁছাতে শুরু করেছে।
১৬ আগস্ট ২০২৬, ডিপসিক তাদের ফ্ল্যাগশিপ এপিআই (API) ব্যবহারের ক্ষেত্রে 'পিক' ও 'অফ-পিক' আওয়ারের পৃথক বিলিং মডেল চালু করে। নতুন এই নীতিমালায় পিক আওয়ারে তাদের প্রধান মডেল V4-Pro-এর আউটপুট খরচ প্রতি মিলিয়ন টোকেনে ৮৭ সেন্ট থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩.৯৬ ডলারে—যা আগের তুলনায় চার গুণেরও বেশি। পাশাপাশি লাইটওয়েট V4-Flash মডেলের খরচ প্রতি মিলিয়ন টোকেনে ২৮ সেন্ট থেকে বাড়িয়ে ১.৩২ ডলার করা হয়েছে। এর মাধ্যমে মে মাসে তাদের ঘোষিত স্থায়ী ও সাশ্রয়ী মূল্যের কাঠামোটি বাতিল হয়ে যায়।
এক সপ্তাহ পর, ২৩ আগস্ট প্রতিষ্ঠানটি কিছুটা ছাড় দেয়। ডিপসিক জানায়, শনিবার ও রবিবার সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে পিক আওয়ারের অতিরিক্ত চার্জ প্রযোজ্য হবে না; পুরো সপ্তাহান্তেই অফ-পিক রেটে এআই ইনফারেন্স চালানো যাবে। যেসব সফটওয়্যার ও ডেটা প্রক্রিয়াকরণ দল তাদের বড় কাজগুলো ছুটির দিনে স্থানান্তর করতে পারে, তাদের জন্য এটি কিছুটা স্বস্তিদায়ক। তবে সামগ্রিক সংকটের সমাধান এতে হচ্ছে না—কর্মদিবসের স্বাভাবিক কর্মঘণ্টায় পিক রেটের খরচ এখনও জুলাইয়ের তুলনায় চারগুণ বেশি।
যে প্রতিষ্ঠান পুরনো সমীকরণ বদলে দিয়েছিল
এই পরিবর্তনের তাৎপর্য অনুধাবন করতে হলে ফিরে যেতে হবে ২০২৫ সালের ২৭ জানুয়ারির বাজারে। সেদিন একক বাণিজ্যিক লেনদেনে এনভিডিয়া প্রায় ৬০০ বিলিয়ন ডলারের বাজারমূল্য হারায়, যা মার্কিন শেয়ারবাজারের ইতিহাসে একক কোনো কোম্পানির জন্য সর্বকালের বৃহত্তম একদিনের পতন।
এই আকস্মিক পতনের নেপথ্যে ছিল চীনের হাংচৌ শহরভিত্তিক ডিপসিকের একটি গবেষণাপত্র। তারা উন্মুক্ত করে R1 নামের একটি রিজনিং মডেল, যা গণিত ও সফটওয়্যার কোডিং বেঞ্চমার্কে ওপেনএআই-এর (OpenAI) শীর্ষ ও-ওয়ান (o1) মডেলের সমকক্ষ ছিল। বিস্ময়কর বিষয় ছিল, এই মডেল তৈরিতে মার্কিন টেক জায়ান্টদের অনুমিত ব্যয়ের সামান্য অংশই খরচ হয়েছিল। ওয়াল স্ট্রিট তাৎক্ষণিকভাবে হিসাব কষে দেখে, ফ্রন্টিয়ার এআই নির্মাণের জন্য যদি সর্বাধুনিক এবং ব্যয়বহুল চিপের অন্তহীন প্রয়োজন না থাকে, তবে চিপ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের অতিমূল্যায়িত মুনাফার ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে পড়ে। সেদিন এনভিডিয়ার শেয়ারদর ১৭ শতাংশ হ্রাস পায়।
সেই প্রেক্ষাপটে প্রচারিত বার্তাটি ছিল স্পষ্ট: সাশ্রয়ী ওপেন-ওয়েট এআই বৈশ্বিক প্রযুক্তি বৈষম্য দূর করবে। পশ্চিমা টেক জায়ান্টদের চড়া লাইসেন্স ফি ছাড়াই বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলো ফ্রন্টিয়ার প্রযুক্তির ওপর কাজ করতে পারবে।
ডিসরাপ্টর থেকে আইপিও জায়ান্ট
দেড় বছর পর, ডিপসিক এখন আর ওপেন-সোর্স আন্দোলনের কোনো নির্মোহ গবেষক দল নয়; বরং একটি প্রথাগত করপোরেট পরাশক্তিতে রূপান্তরিত হয়েছে। ২০২৬ সালের এপ্রিলে কোম্পানিটির ব্যক্তিগত মূল্যায়ন ছিল প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার। জুনের মধ্যে টেনসেন্ট, সিএটিএল, জেডি.কম, নেটইজ এবং চীনের ন্যাশনাল এআই ইন্ডাস্ট্রি ইনভেস্টমেন্ট ফান্ডের অংশগ্রহণে সম্পন্ন হওয়া ৭.৪ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ রাউন্ডে কোম্পানিটির বাজারমূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলারে।
পরবর্তী অর্থায়ন প্রক্রিয়াটি অবশ্য কিছু বাধার মুখে পড়ে। ৭৪ বিলিয়ন ডলারের মূল্যায়নে আরও ৮ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহের দ্বিতীয় ধাপটি জুলাইয়ের শেষে সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়। প্রতিষ্ঠাতা লিয়াং ওয়েনফেংয়ের একটি অভ্যন্তরীণ বৈঠকের নথি ফাঁসের পর এটি ঘটে, যেখানে তিনি এনভিডিয়ার হার্ডওয়্যারের ওপর ডিপসিকের চলমান নির্ভরতা এবং আমেরিকার সাথে চীনের প্রযুক্তিগত ব্যবধান নিয়ে কথা বলেছিলেন। আগস্টের শুরুতে মনোলিথ ম্যানেজমেন্টের মতো আন্তর্জাতিক তহবিলের সাথে পুনরায় আলোচনা শুরুর মাধ্যমে সেই প্রক্রিয়া সচল হয়।
এই মূল্যায়নের ভিত্তিতে ব্লুমবার্গের বিলিয়নেয়ার ইনডেক্স অনুযায়ী লিয়াং ওয়েনফেং বর্তমানে আনুমানিক ৩৬ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ নিয়ে এআই শিল্পের শীর্ষ ধনী ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছেন।
কর্পোরেট কাঠামোর দিক থেকে ডুয়েল-ক্ল্যাস শেয়ার পদ্ধতির মাধ্যমে লিয়াংয়ের নিয়ন্ত্রণ অক্ষুণ্ণ রাখা হয়েছে। বাণিজ্যিক বিনিয়োগকারীদের ক্ষেত্রে পাঁচ বছরের জন্য ভোটিং অধিকার স্থগিত রাখা হলেও চীনের রাষ্ট্রীয় এআই ফান্ড পরিচালনা পর্ষদের আসন ও ভোটিং ক্ষমতার অধিকারী। ২০২৭ সালের সম্ভাব্য অভিষেকের জন্য আইপিও ফাইলিং নিশ্চিত করার পর বাণিজ্যিক ভারসাম্য রক্ষায় প্রতিষ্ঠানটি এখন ফ্রিমিয়াম মডেল থেকে বের হয়ে রাজস্ব আদায়ে মনোযোগী হয়েছে।
সস্তা এআই শেষ হয়নি, ঠিকানা বদলেছে
ডিপসিকের মূল্যবৃদ্ধির অর্থ ওপেন-ওয়েট প্রযুক্তির সমাপ্তি নয়; বরং প্রতিযোগিতা এখন অন্যান্য সরবরাহকারীর দিকে সরে গেছে।
২০২৬ সালের জুনে আলিবাবা তাদের Qwen মডেলের বাণিজ্যিক মূল্য ৪০ শতাংশ কমিয়েছে। জুলাইয়ে মুনশট এআই-এর Kimi K3 বাজারে আসার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে অতিরিক্ত ট্রাফিকের চাপে নতুন ব্যবহারকারী নিবন্ধন সাময়িকভাবে বন্ধ করতে বাধ্য হয়। চীনের Z.ai (GLM) এবং ইউরোপের মিস্ট্রাল (Mistral) এখনও ডিপসিকের নতুন পিক রেটের চেয়ে অনেক কম খরচে সার্ভিস দিচ্ছে।
আন্তর্জাতিক এআই ট্রাফিকের ক্ষেত্রেও চীনা মডেলগুলোর প্রাধান্য দৃশ্যমান। এআই মডেল ব্যবহারের নিরপেক্ষ প্ল্যাটফর্ম ওপেনরাউটার (OpenRouter)-এর তথ্যমতে, এক বছর আগেও তাদের মোট ট্রাফিকের প্রায় ৭০ শতাংশ ছিল যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক মডেলগুলোর দখলে। ২০২৬ সালের মাঝামাঝি নাগাদ মার্কিন মডেলের অংশ নেমে এসেছে ৩০ শতাংশে, আর বাকি ৭০ শতাংশই পরিচালিত হচ্ছে ওপেন-ওয়েট আর্কিটেকচারে। ওপেনরাউটারের মোট টোকেন ব্যবহারের প্রায় ১৮ শতাংশ একাই নিয়ন্ত্রণ করছে ডিপসিক।
বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সিং অর্থনীতিতে প্রত্যক্ষ প্রভাব
বাংলাদেশের জন্য এআই ব্যবহারের এই বর্ধিত ব্যয় নিছক আন্তর্জাতিক কোনো করপোরেট ঘটনা নয়; এটি দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় রপ্তানি খাতের মুনাফার ওপর সরাসরি আঘাত।
বাংলাদেশে বর্তমানে সাড়ে ৬ লাখেরও বেশি সক্রিয় ফ্রিল্যান্সার রয়েছেন, যারা বছরে ৫০০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি বৈদেশিক মুদ্রা দেশে নিয়ে আসেন। কেবল ২০২৫ সালের প্রথমার্ধেই দেশের আইটি-সক্ষম সেবা (আইটিইএস) খাতের আউটসোর্সিং আয় ছুঁয়েছে ৯০০ মিলিয়ন ডলার।
বর্তমান ফ্রিল্যান্সিং কাজের বড় অংশ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এপিআই টুলের ওপর সরাসরি নির্ভরশীল। কনটেন্ট স্থানীয়করণ, প্রোগ্রামিং কোড জেনারেশন কিংবা ডিজিটাল মিডিয়া পোস্ট-প্রোডাকশনের কাজগুলোতে এআই টোকেন এখন অপরিহার্য ডিজিটাল কাঁচামাল। কর্মদিবসের ব্যস্ত সময়ে এপিআই ব্যবহারের খরচ চারগুণ বেড়ে যাওয়ায় স্থানীয় ফ্রিল্যান্সার এবং সফটওয়্যার ডেভেলপারদের পরিচালন ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বেসরকারি খাত যেভাবে এগিয়েছে, নীতিগত পর্যায়ে দেশের প্রস্তুতি সেভাবে দৃশ্যমান হয়নি। 'জাতীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নীতিমালা ২০২৬–২০৩০'-এর খসড়া যাচাইকরণ গত ৮ ফেব্রুয়ারি শেষ হলেও এটি এখনো আইসিটি বিভাগে চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। প্রতিবেশী শ্রীলঙ্কা ও নেপাল ইতোমধ্যেই তাদের জাতীয় এআই কৌশল চূড়ান্ত করেছে।
ইউনেস্কো এবং ইউএনডিপির সহায়তায় পরিচালিত যৌথ মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বাংলাদেশের বেশ কিছু কাঠামোগত দুর্বলতা চিহ্নিত হয়েছে:
- মন্ত্রণালয়ভিত্তিক তথ্যের বিচ্ছিন্নতা
- স্থানীয়ভাবে জিপিইউ (GPU) অবকাঠামোর তীব্র ঘাটতি
- শিক্ষাক্রমে এআই ও ডেটা সায়েন্সের অনুপস্থিতি
- এআই নৈতিকতা সম্পর্কিত প্রাতিষ্ঠানিক নির্দেশিকার অভাব
- প্রযুক্তি খাতে নারীদের সীমিত অংশগ্রহণ
হার্ডওয়্যার সক্ষমতার ক্ষেত্রে অগ্রগতি অত্যন্ত সীমিত। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ ও জাতীয় ডেটা সেন্টার যৌথভাবে ২০টির বেশি অব্যবহৃত এনভিডিয়া ভোল্টা টেনসর কোর জিপিইউ সচল করে একটি ক্লাউড কম্পিউটিং প্ল্যাটফর্ম চালু করে। প্রায় ৯০০টি প্রমিত সিপিইউর ক্ষমতাসম্পন্ন এই পাইলট প্রকল্পটি সরকারি উদ্যোগে একটি ইতিবাচক সূচনা হলেও দেশের ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যিক চাহিদার তুলনায় এটি নিতান্তই অপ্রতুল।
প্রযুক্তিগত স্বাবলম্বিতার স্থায়ী পথ
সার্বিক বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক বাজারের এই অস্থিরতার মধ্যেও দেশের ভেতরে কিছু গবেষণাধর্মী কাজ নিজস্ব গতিতে এগিয়ে চলেছে।
মেটার ওপেন-সোর্স কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে তৈরি বাংলালামা (BanglaLlama) এবং টাইগার-এলএলএম (TigerLLM)-এর মতো দেশীয় মডেলগুলোর উন্নয়ন অব্যাহত রয়েছে। জাতীয় শিক্ষাক্রমের পাঠ্যপুস্তক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বেচ্ছাসেবকদের সহায়তায় এগুলোকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া বেঙ্গলি.এআই (Bengali.AI) সম্প্রদায় হস্তলিপি, কণ্ঠস্বর ও ডকুমেন্ট প্রসেসিংয়ের উন্মুক্ত ডেটাসেট তৈরি করছে এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক দল স্থানীয় উপভাষার স্বয়ংক্রিয় অনুবাদ নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে।
ডিপসিকের এই নতুন বাণিজ্যিক রূপ একটি মৌলিক সত্যকে স্পষ্ট করে দিয়েছে: কোনো বিদেশি প্রতিষ্ঠানের বাণিজ্যিক ছাড়ের ওপর জাতীয় ডিজিটাল সক্ষমতা গড়ে উঠতে পারে না। টেকসই ডিজিটাল রূপান্তরের মূল ভিত্তি হলো নিজস্ব ডেটাসেন্টার, রাষ্ট্রীয় জিপিইউ ক্লাস্টার, বাস্তবসম্মত আইনি কাঠামো এবং বাংলা ভাষার উন্মুক্ত ডেটাসেট। আন্তর্জাতিক বাজারে এআইয়ের মূল্য ওঠানামা করবেই; তবে সেই পরিবর্তনের সাথে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশ কত দ্রুত নিজস্ব কম্পিউটিং পরিকাঠামো গড়ে তুলতে পারছে, সেটিই এখন আসল বিবেচ্য বিষয়।


